কিছুই ভালো লাগছে না কেন? মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি ও তার বাস্তব সমাধান

কিছুই ভালো লাগছে না কেন? মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি ও তার বাস্তব সমাধান

Introduction

আজকাল আমার কিছুই ভালো লাগছে না। আমি বুঝতে পারছি না ঠিক কী কারণে আমার কোনো কিছু ভালো লাগছে না। যদি কাজের কথা ভেবে কাজে হাত লাগাই, তাহলেও কিছুক্ষণ পর আবার সেই ভালো না লাগার ব্যাপার ফিরে ফিরে আসে। ফোন ঘাটতেও ভালো লাগছে না, কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো—এই ফোন ঘাটতে ভালো না লাগলেও ঘেঁটে যাচ্ছি, অবিরাম অবিশ্রান্তভাবে। শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না, বাইরে যেতে ভালো লাগছে না, লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না। শখের জিনিস যেমন—গাছপালার যত্ন নেওয়া, মাছের অ্যাকোরিয়ামে সময় কাটানো, গান শোনা বা গান গাইতেও ভালো লাগছে না; ব্যবহার খিটখিটে হয়ে গেছে। মানে হলো পুরো জীবনটা যেন খাবার থেকে বেছে ফেলে দেওয়া তেজপাতার মতো হয়ে গেছে। কী হয়েছে আমার? মানসিক অবসাদ? আচ্ছা, আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? এই সমস্যার সম্মুখীন হলে এই আর্টিকেলটা একবার পড়ে দেখো, কথা দিচ্ছি এই সমস্যার একটু হলেও সমাধান পাবে।

মানসিক অবসাদ এবং একাকীত্ব বোধ করছেন এমন একজন ব্যক্তির প্রতিকৃতি

আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?

শোনো বন্ধু, তুমি পাগল হচ্ছ না—এটা আমি খুব পরিষ্কার করে আগে বলি কেমন! তোমার এই সমস্যাগুলি ভয়ংকর শোনালেও এটা অনেক মানুষের জীবনে আসা এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি বা অবসাদের লক্ষণ।

কিছুই ভালো লাগছে না—এই সমস্যাগুলো কী বোঝায়?

আচ্ছা, এই সমস্যাগুলি আমি একটু ভেঙে বলি—

কিছুই ভালো লাগছে না
যে কাজগুলো আগে আনন্দ দিত বা তোমার শখের হবি, সেগুলোও আর ভালো লাগছে না। ফোন ভালো না লাগলেও স্ক্রল থামাতে পারছ না। শুয়ে থাকাও কষ্টকর, বাইরে যাওয়াও কষ্টকর। মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, খিটখিটে হয়ে যাচ্ছ—কী, তাই তো? মোটের ওপর কথা হলো ভেতরে ভেতরে একটা শূন্যতা + বিরক্তি + অস্থিরতা।

এগুলোকে একসাথে বলে Anhedonia + Mental Exhaustion। আরও সহজ করে বললে: মনটা এতটাই ক্লান্ত হয়ে গেছে যে আনন্দ নেওয়ার ক্ষমতাই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সব দিক থেকে তুমি যেন বন্দী, ঠিক যেন কেউ তোমাকে অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রেখেছে।

তাহলে এটা কি মানসিক অবসাদ (Depression)?

তাহলে এটা কি “মানসিক অবসাদ”?
সোজা-সাপ্টা উত্তর হলো—হ্যাঁ, হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ডিপ্রেসিভ ফেজ হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই না তুমি সারাজীবনের জন্য এমন হয়ে যাবে—না, একদমই সেরকম না। আর এটা পাগল হওয়া নয়। পাগল হলে মানুষ বুঝতেই পারে না যে তার কিছু হচ্ছে। তুমি বুঝছ, প্রশ্ন করছ—এটাই সুস্থতার লক্ষণ। শুধু আর একটু নিজেকে হালকা অনুভব করতে হবে। কীভাবে হালকা হবে? এসো আর একটু গভীরে যাই।

ফোন স্ক্রল করেও ভালো লাগছে না—এর কারণ কী?

ফোন স্ক্রল করেই যাচ্ছি কিন্তু তাও বেশিক্ষণ ভালো লাগছে না—এই ব্যাপারটা কেন হচ্ছে?
প্রথমে বলি এই যে পুরো ব্যাপার টা তুমি ফোন ঘেঁটে যাচ্ছ কিন্তু ভালো লাগছে না তার পড়েও কনটিনিউসলি ফোন ঘাঁটছো এটাকে ইংরেজিতে বলে Doom scrolling এই ব্যপারে অন্য একটি নিবন্ধ লেখা যাবে পরে এখন বর্তমানে ফিরে আসি। তো যেটা বলছিলাম এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা যা বর্তমান সমাজের অনেক মানুষ ভোগছে। ফোন ভালো লাগছে না তবুও স্ক্রল করছ, এর সঠিক কারণ কী?

এরকম হওয়ার কারণ মন ডোপামিনের খুব ছোট ছোট শট খুঁজছে। ডোপামিন হলো এক রকম কেমিক্যাল যা আমাদের মস্তিষ্ক খুশি হলে রিলিজ করে। সত্যি বলতে ফোনে কোনো আনন্দ নেই, শুধু ব্যথা থেকে পালানোর চেষ্টা। কারণ ফোনে বিনোদনের পরিমাণটি বেশি পাওয়া যায় আজকাল, যেমন—মিম, কোনো মজার ভিডিও; তাই থামাতে পারছ না, কিন্তু শান্তিও পাচ্ছ না। এটার কারণ কিন্তু অলসতা না, আসলেই এটা তোমার নার্ভাস সিস্টেমের ওভারলোড।

জীবনটা তেজপাতার মতো লাগছে—এই ভাবনার মানে কী?

জীবনটা “তেজপাতার মতো” লাগছে, আমাকে কেউ চায় না
এই উপমাটা খুব গভীর। এই ধরনের কথা যদি তুমি ভাবো, সেটা আসলে এটা বোঝাচ্ছে: “আমি যেন জীবনের স্বাদে আর অংশ নিচ্ছি না, শুধু পাশে পড়ে আছি, কেউ আমার ব্যাপারে খেয়ালও রাখে না।”

এইরকম ভেবো না, কারণ এটা নিজেকে মূল্যহীন ভাবা শুরু হওয়ার একটা সিগন্যাল। সুতরাং নিজের খেয়াল নিজে রাখতে শেখো। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা একা এসেছি, একাই যাব। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে যখন কেউ আমাদের যত্ন নেয়, খেয়াল রাখে, তখন আমাদের খুব ভালো লাগে। আরে বাবা তোমাকে কী বলব, আমি নিজেই তো এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। তবে এখন আর এভাবে ভাবি না—কে খোঁজ নিল না নিল, কে আসবে কী যাবে, এইসব বন্ধ করো। যদি এত কিছু পড়েও তোমার এইরকম মনে হতে থাকে, তাহলে আমি বলব কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নাও যত দ্রুত সম্ভব, কারণ এই জিনিস অবহেলা করা ঠিক না।

মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি থেকে বেরোনোর বাস্তব সমাধান

তাহলে এই সবকিছুর সমাধান কী?
তাহলে এখনই তোমার কী করা উচিত? শোনো, খুব বাস্তবভাবে বলছি:

  1. নিজেকে জোর করো না ‘ভালো লাগতেই হবে’। ভালো না লাগাটাকে আজকে অসুখ হিসেবে মেনে নাও, ব্যর্থতা হিসেবে না।
  2. বড় কিছু করতে যেও না। আজ গাছের যত্ন? না। আজ গান? না। আজ শুধু: মুখে জল দেওয়া, একটু হাঁটা, চোখ বন্ধ করে ৫ মিনিট শ্বাস নেওয়া—এইটুকুই যথেষ্ট।
  3. ফোন একদম বন্ধ বলছি না কিন্তু একবার চেষ্টা করো: ১০ মিনিট ফোন, ৫ মিনিট ফোন নামিয়ে রেখে শুধু বসে থাকা। মন খারাপ হবে—এটাই স্বাভাবিক। ওটাই বেরোতে চাইছে।
  4. কারও সঙ্গে একদম না হলেও ২–৩ মিনিট কথা। সব কথা বলতে হবে না। শুধু বলো: “আজ মনটা খুব ভারী লাগছে”—এই ধরনের কিছু শব্দ।

কখন অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া দরকার?

এই সমস্যায় গুরুতর কিছু হলে কী করা উচিত?
খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা এবং আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি—এই অবস্থা যদি ২ সপ্তাহের বেশি থাকে, বা ঘুম/খাওয়া খুব বেশি বিগড়ে যায়, বা নিজের প্রতি ঘৃণা/অর্থহীন লাগা বাড়ে, তাহলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া জরুরি। ওষুধ মানেই খারাপ না—অনেক সময় এটা শুধু ব্রেনের কেমিস্ট্রি ব্যালেন্স করে। আর কেউ কিছু ভাববেও না।

উপসংহার

প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে তুমি একা নও। তুমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছ না। তুমি শুধু একটু বেশিই ক্লান্ত, আর ক্লান্ত মানুষদের বিশ্রাম দরকার—বিচার নয়। যদি চাও, তুমি তোমার অনুভূতিগুলো কোনো এক বিশ্বাসযোগ্য মানুষকে বলতে পারো।

এই অনুভূতিটা কবে থেকে শুরু হলো? তোমার কোনো অভ্যাস এই পরিস্থিতির জন্য কোনো সূত্রপাত করছে না তো? অথবা কোনো একটা চিন্তা কি বারবার মাথায় ঘুরছে? আমি এখানেই আছি, তুমি এই ব্লগের কমেন্ট বক্সে লিখে জানাতে পারো অথবা যোগাযোগ পেজে গিয়ে সেখানেও জানাতে পারো। কথা বললে বোঝা একটু হলেও হালকা হবে।


আরোও পড়ুন 

বাটারফ্লাই এফেক্ট: ছোট ঘটনা থেকে বিশাল পরিবর্তন


আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন

মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আরও জানতে আমাদের ফলো করুন: